জানা ছাড়া মানা যায় না

ইসলাম যেহেতু নিখুঁত মতাদর্শ এবং পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, সে জন্যে জ্ঞান ছাড়া এ আদর্শ ও জীবন-ব্যবস্থার অনুসারী হওয়া যায় না। সহজ কথায় বলতে গেলে, ইসলাম এমন একটি জীবন ব্যবস্থা যার অপরিহার্য দাবি হলো, তাকে জানা ও মানা। আর মুসলিম বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যিনি ইসলামকে জানেন এবং মানেন।

অবশ্য এই মূলনীতিটি সকল কার্যকরী ও নির্বাহী ব্যাপারেই প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা মানব জীবনের সর্বস্তরে ইসলামকে মানার ও কার্যকর করার জন্যেই পাঠিয়েছেন। না জেনে, না বুঝে যেহেতু কোনো কিছুই মানা ও কার্যকর করা যায় না, ইসলাম তো বটেই, সেজন্যে ইসলামকে জানা বুঝা এবং ইসলামের সঠিক ও যথার্থ জ্ঞানার্জন করা অতীব জরুরি ও অপরিহার্য-ফরয।

মহাবিশ্ব ও এই পৃথিবীর মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি হিসেবে দীন ইসলামকে শুধু পাঠিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং ইসলামকে জানা-বুঝারও নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশ দিয়েছেন, ইসলামের জ্ঞানার্জন করার। ইসলামের বাস্তব শিক্ষা দেয়ার জন্যে তিনি রসূলও পাঠিয়েছেন। রসূল সা. শিক্ষক ও আদর্শ নেতা হিসেবে বাস্তবে শিক্ষা দানের মাধ্যমে তাঁর সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে গেছেন।

কুরআনের আলোকে জ্ঞানার্জন

আমরা এখানে ইসলামের জ্ঞানার্জন সম্পর্কে আল কুরআন থেকে মহান আল্লাহর কিছু বাণী উল্লেখ করছি:

১. ‘পড়ো, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ -সূরা আলাক : আয়াত ১।

২. ‘বলো: প্রভু! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও।’ -সূরা তোয়াহা : আয়াত ১১৪।

৩. ‘যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করে জেনে নাও।’ -সূরা ১৬ আন নহল : আয়াত ৪৩।

৪. ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের সুউচ্চ মর্যাদা দান করবেন। -সূরা ৫৮ মুজাদালা : আয়াত ১১।

৫. ‘যারা জানে আর যারা জানে না এই উভয় ধরনের লোক কি সমান হতে পারে?’ -সূরা ৩৯ জুমার : আয়াত ৯।

৬. ‘এবং সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানী লোকরাও এই সাক্ষ্যই দেয় যে মহাপরাক্রমশালী বিজ্ঞানময় আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ -সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ১৮।

৭. আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে তাকে (তালুতকে) শাসক মনোনীত করেছেন, কারণ তাকে তিনি অঢেল মানসিক (জ্ঞানগত) ও শারীরিক যোগ্যতা দান করেছেন।’ -সূরা আল ২ বাকারা : আয়াত ২৪৭।

৮. ‘এমন কোনো জিনিসের পিছে লেগে পড়ো না, যে বিষয়ে তোমাদের জ্ঞান নেই।’ -সূরা ১৭ বনি ইসরাঈল : আয়াত ৩৬।

৯. ‘আল্লাহকে সেভাবে স্মরণ করো, যেভাবে তিনি তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন।’ -সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৩৯।

১০. ‘আল কুরআন পাঠ করো তরতিলের সাথে -অর্থাৎ বুঝে বুঝে ভাব প্রকাশযোগ্য ভঙ্গিতে)।’ -সূরা ৭৩ মুজ্জামিল : আয়াত ৪।

১১. ‘যখন কুরআন পাঠ করবে, তখন অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে পাঠ শুরু করবে।’ -সূরা ১৬ আন নহল : আয়াত ৯৮।

‘আল্লাহর বান্দাহদের মধ্যে কেবল জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরাই তাঁকে ভয় করে।’ -সূরা ৩৫ ফাতির : আয়াত ২৮।

‘কিন্তু জ্ঞানের অধিকারী লোকেরা বললো: তোমাদের অবস্থার জন্যে দুঃখ হয়! যে ব্যক্তি ঈমান আনে এবং আমলে সালেহ করে, তার জন্যে তো আল্লাহর পুরস্কারই উত্তম। ’ -সূরা ২৮ আল কাসাস : আয়াত ৮০।

‘আল্লাহ অতি প্রশস্ত উদার মহাজ্ঞানী। তিনি যাকে চান জ্ঞান দান করেন। আর যাকে জ্ঞান দেয়া হয়, সে তো বিরাট কল্যাণের অধিকারী। শিক্ষা লাভ করে তো কেবল তারাই যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী’। -সূরা ২ বাকারা : আয়াত ২৬৮-২৬৯।

‘যেমন আমি তোমাদের থেকেই তোমাদের কাছে একজন রসূল পাঠিয়েছি। সে তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শুনায়, তোমাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ ও বিকশিত করে তোলে, তোমাদের আল কিতাব ও হিকমাহ (কর্মকৌশল) শিক্ষা দেয়, তোমাদের আরো শিক্ষা দেয় তোমরা যা কিছু জানো না সেগুলো।’ -সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ১৫১।

 

হাদিসের আলোকে জ্ঞানার্জন

আল কুরআনের এ আয়াতগুলো থেকে মুসলিমদের জন্যে জ্ঞানার্জনের অপরিহার্যতা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো। জ্ঞানার্জন সম্পর্কে রসূলুল্লাহও সা. বিশেষভাবে তাগিদ করেছেন। তিনি বলেছেন :

১. ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দীনের সঠিক বুঝ-জ্ঞান দান করেন।’ -সহীহ বুখারি ও মুসলিম।

২. ‘সোনা রূপার খনির মতো মানুষও (বিভিন্ন প্রকারের) খনি। তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উত্তম (গুণ বৈশিষ্ট্যধারী) হয়ে থাকে, দীনের সঠিক বুঝ-জ্ঞান লাভ করতে পারলে ইসলাম গ্রহণের পরও তারাই উত্তম মানুষ হয়ে থাকে।’ -সহীহ মুসলিম : আবু হুরাইরা রা.।

৩. ‘জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের হারানো ধন। সুতরাং যেখানেই তা পাওয়া যাবে, প্রাপকই তার অধিকারী। -তিরমিযি।

৪. ‘ইসলামের একজন সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি শয়তানের জন্যে হাজারো (অজ্ঞ) ইবাদতগুজারের চাইতে ভয়ংকর।’ -তিরমিযি।

৫. ‘জ্ঞানান্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের একটি অবশ্য কর্তব্য কাজ।’ -ইবনে মাজাহ, বায়হাকি।

৬. ‘দীনের জ্ঞানী ব্যক্তি কতইনা উত্তম মানুষ। তার কাছে লোকেরা এলে তিনি তাদের উপকৃত করেন, আর না এলে তিনি কারো মুখাপেক্ষী হন না।’ -রিযযীন, মিশকাত।

৭. ‘জ্ঞানের আধিক্য (নফল) ইবাদতের আধিক্যের চাইতে উত্তম।” -বায়হাকি : আয়েশা রা.।

৮. ‘সর্বোত্তম মানুষ হলো তারা, জ্ঞানীদের মধ্যে যারা উত্তম।’ -দারমি।

৯. ‘কোনো বাবা মা তাদের সন্তানদের উত্তম আদব কায়দা শিক্ষা দেয়ার চাইতে শ্রেষ্ঠ কিছু দান করতে পারে না। -তিরমিযি।

১০. ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের কোনো পথ অবলম্বন করে, তাতে আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন। যখন কিছু লোক আল্লাহর কোনো ঘরে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব (কুরআন) পড়ে এবং নিজেদের মাঝে তার মর্ম আলোচনা করে, তখন তাদের উপর নেমে আসে প্রশান্তি, ঢেকে নেয় তাদেরকে আল্লাহর রহমত, পরিবেষ্টিত করে তাদেরকে ফেরেশতাকুল। তাছাড়া আল্লাহ তাঁর কাছের ফেরেশতাদের নিকট তাদের কথা আলোচন করেন। যার আমল (কর্ম) তাকে পিছিয়ে দেয়, তার বংশ তাকে এগিয়ে দিতে পারে না।’ -সহীহ মুসলিম।

১১. ‘ফেরেশতারা জ্ঞানান্বেষণকারীদের জন্যে নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেয় (অর্থাৎ তাদের সহযোগিতা করে ও উৎসাহিত করে)’। -মুসনাদে আহমদ।

১২. ‘জ্ঞান লাভে নিরত ব্যক্তি তা থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত বলে গণ্য হয়।’ -তিরমিযি, দারমি।

১৩. ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানান্বেষণে আত্মনিয়োগ করে, এ কাজের ফলে তার অতীতের দোষত্রুটি মুছে যায়।’ -তিরমিযি, দারমি।

১৪. ‘তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো মানুষ সে, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যদের শিখায়।’ -বুখারি : উসমান রা.।

১৫. ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানান্বেষণ করে তা অর্জন করেছে, তার জন্যে দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে। আর যদি তা লাভ করতে নাও পেরে থাকে তবু তার জন্যে একগুণ প্রতিদান রয়েছে।’ -দারমি।

১৬. ‘রাতের কিছু অংশ জ্ঞান চর্চা করা, সারা রাত (ইবাদতে) জাগ্রত থাকার চাইতে উত্তম।’ -দারমি।

১৭. ‘জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীরা, এমনকি পানির নিচের মাছ। অজ্ঞ ইবাদতগুজারের তুলনায় জ্ঞানী ব্যক্তি ঠিক সেরকম মর্যাদাবান, যেমন পূর্ণিমা রাতের চাঁদ পৃথিবীবাসীর কাছে তারকারাজির উপর দীপ্তিমান। আর জ্ঞানীরা নবীদের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী।’ -আহমদ, তিরমিযি, আবু দাউদ।

কোন্ জ্ঞান অর্জন করা ফরয?

জ্ঞানের রয়েছে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা। একজন মুসলিমের জন্যে কোন্ জ্ঞান এবং কতটুকু জ্ঞানার্জন করা ফরয? এ বিষয়টি জানা থাকা জরুরি। ইসলামের আলোকে গুরুত্বের দিক থেকে জ্ঞানকে কয়েকভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

১. দীন ও শরীয়া সংক্রান্ত জ্ঞান : এ জ্ঞান অর্জন করা ফরয। অর্থাৎ একজন মুসলিমকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ঈমান-আকিদা সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞান লাভ করতে হবে। ইসলামের মৌল নীতিসমূহ তার জানা থাকতে হবে। শরীয়তের মৌলিক বিধি-বিধানসমূহ তার জানা থাকতে হবে। সর্বোপরি শরীয়তের মৌলিক বিধি-বিধানসমূহ পালন করা, প্রয়োগ করা এবং বাস্তবায়ন করার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি তার জানা থাকতে হবে। নিজের জীবিকা উপার্জনের হালাল ও বৈধ প্রক্রিয়া তার জানা থাকতে হবে। এসব জ্ঞান অর্জন করা তার জন্যে ফরয।

২. দীনের অনুসন্ধানী জ্ঞান : মুসলিমদের মধ্যে সর্বকালেই এমন এক গ্রুপ লোক ছিলেন এবং থাকতে হবে, যারা ইসলামের অনুসন্ধানী জ্ঞানার্জন করবেন এবং ইজতিহাদ করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যুগ-সমস্যা ও নতুন নতুন বিষয়সমূহের সমাধান পেশ করা এ গ্রুপের দায়িত্ব। দীনের অনুসন্ধানী জ্ঞানার্জন করা ফরয না হলেও ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ একদল লোককে অবশ্যি এ জ্ঞানার্জনে এগিয়ে আসতে হবে।

৩. মুস্তাহাব জ্ঞান : উপরোক্ত দুই ধরনের জ্ঞান ছাড়া মানব সমাজের জন্যে কল্যাণকর অন্যান্য জ্ঞানার্জন করা মুস্তাহাব বা পছন্দীয়।

৪. ক্ষতিকর জ্ঞান : যেসব বিষয়ের জ্ঞানে ব্যক্তি বা মানব সমাজের কোনো কল্যাণ নেই, বরং ক্ষতিকর ও সময় অপচয়কর, কোনো মুসলিমের উচিত নয় সেসব জ্ঞান অর্জন করা। রসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন : ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পানাহ চাই সেই জ্ঞান থেকে যাতে কোনো কল্যাণ নেই এবং সেই অন্তর থেকে যার মধ্যে তোমার ভয় নেই।’

 

লেখকঃ আবদুস শহীদ নাসিম

(Visited 30 times, 1 visits today)